আজ মিরপুরে কি আবারও পুনরাবৃত্তি ? নাকি…..

ত্রিদেশীয় সিরিজ ফাইনাল, ২০০৯, বিপক্ষ শ্রীলঙ্কা, মিরপুর

২ উইকেটে হার

নাজমুলের ক্যারিয়ার ঠিক উড়ন্ত নয়।

একটু পরপরই তাকে নেমে আসতে হয়েছে মাটিতে।  আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারটা সেই যে ২০১২ সালে মুখ থুবড়ে পড়েছে, পেখম মেলেনি আর।

সেই নাজমুল সেদিন উড়ছিলেন।  সঙ্গে মাশরাফি।  সঙ্গে সাকিব।  ফাইনাল ম্যাচ, সংগ্রহ ১৫২ রান।  সেটা ওড়ার রসদ জোগায় না।  কিন্তু ৮ম ওভারে গিয়ে প্রতিপক্ষের যদি ৬ রানেই নেই হয়ে যায় ৫ উইকেট? সেটা উড়বার চেয়েও বড় শক্তি জোগায়।  নাজমুলরা তাই উড়ছিলেন।

মাটিতে নামিয়ে আনলেন কুমার সাঙ্গাকারা।  প্রথমে জিহান মুবারকের সঙ্গে জুটি ৪৫ রানের।  বাংলাদেশ তবুও মুখ থুবড়ে পড়লো না।  এরপর সাঙ্গাকারার সঙ্গী ফারভিজ মাহরুফ, ৭ম উইকেটে জুটি ৬৩ রানের।  সাঙ্গাকারাকে একজন বাংলাদেশী হয়ে ‘অপছন্দ’ করার যথেষ্ট কারণের জোগান তিনি নিয়মিতই দিয়ে গেছেন।  সেই সাঙ্গাকারাকে সরিয়ে দিলেন সাকিব।  সাকিব, তিনি যেবার হয়ে উঠতে শুরু করেছিলেন বাংলাদেশের সুপারম্যান।  সাঙ্গাকে সরালেন, সে ওভারে সরালেন নুয়ান কুলাসেকেরাকেও।  ৪ উইকেটে ৪২ বলে ৩৯ রানের চাহিদাটা শ্রীলঙ্কার এক ওভার পরই বদলে গেল ২ উইকেটে ৩৬ বলে ৩৬ রানে।  সাকিব আবার গ্যাসোলিন জোগালেন।

তবে তখনও পাখির ‘হামলা’য় ইঞ্জিন বিকল হয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটেনি।  মুত্তিয়া মুরালিধরন বোলিংয়ে বাংলাদেশকে দুঃস্বপ্ন দিয়েছেন অনেক, কোনটা ছেড়ে কোনটা বলা হবে, সে নিয়েই বিতর্ক হতে পারে।  তবে মুরালি ব্যাটিংয়ে বাংলাদেশের সামনে অগ্নিমূর্তি ধারণ করেছিলেন ওই একবারই।  শুধু বাংলাদেশ নয়, মুরালি যে কোনও প্রতিপক্ষের বিপক্ষেই ব্যাটিংয়ে এতটা কার্যকরী হননি কখনও।  উড়ন্ত বিমানে ছোট পাখির আঘাতই যথেষ্ট, মুরালি সেদিন হয়ে উঠেছিলেন বাজপাখি।  অথবা ঈগল।  অথবা অন্যকিছু।

চার।  চার।  দুই।  চার।  ডট।  ছয়।  ৩০ বলে ৩৫ রানের সমীকরণটা মুরালি নামিয়ে আনলেন ২৪ বলে ১৫ রানে।  অভাগা বোলারের নাম রুবেল হোসেন।  সে সিরিজেই অভিষেক হয়েছিল তার।  পরের ওভারে সাকিব দিলেন দুই।  দুই ওভার বাকি, অধিনায়ক মোহাম্মদ আশরাফুলের হাতে দুইজন বোলার- নাইম ইসলাম ও রুবেল।  বুকে সাহস দিয়ে রুবেলকে বল দিলেন আশরাফুল।  শেষ ২ বলে মুরালি নিলেন ১০।

রুবেল এরপর অনেক উড়েছেন।  নাজমুল সেদিন ক্ষণিকের জন্য উড়েছিলেন।  সাকিব এরপর বাংলাদেশকে নিয়ে উড়েছেন অনেকবার।

তবে সেবার সব উড়িয়ে দিয়েছিলেন মুরালিধরন।  তার ক্যারিয়ার সর্বোচ্চ ইনিংস খেলে।

এশিয়া কাপ ফাইনাল, ২০১২, বিপক্ষ পাকিস্তান, মিরপুর

২ রানে হার

কান্না কতো রকমের?

একটা প্রকার অবশ্যই বুকচেপে রাখা কান্না।

ফ্ল্যাশব্যাকে তামিমের চার আঙ্গুল দেখানো।  এপাশে মুশফিকুর রহিম জড়িয়ে ধরছেন সাকিব আল হাসানকে।  ফ্ল্যাশব্যাকে মুশফিকের স্লগ সুইপ।  এপাশে সাকিব ছলছল চোখে মুশফিককে সান্ত্বনা দিতে ব্যস্ত।  শচীনের শততম সেঞ্চুরি ছাপিয়ে বাংলাদেশের জয়, আর এদিকে জার্সি তুলে চোখ মোছা নাসির হোসেন।  ফ্ল্যাশব্যাক-বর্তমান-ফ্ল্যাশব্যাক-বর্তমান।  ফ্ল্যাশব্যাকে এশিয়া কাপ বাংলাদেশের কাছে এক রুপকথার নাম।  আর ফাইনালটা সে রুপকথার নিষ্ঠুর বাস্তবতার এক রূপ।

ফাইনালটা আসলে কিভাবে হেরেছিল বাংলাদেশ?

২৩৭ রান করতে হবে, ৫ম উইকেটে সাকিব-নাসিরের ৮৯ রানের জুটি।  রান আর বলের দূরত্বটা কমাতে নাসিরের পুল ব্যর্থ।  সাকিব ছিলেন, আশা হয়ে।  সাকিব সে টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড়, তিনি থাকা মানেই বাড়তি আশা।  সেই সাকিব খানিকবাদেই বড় শট খেলতে গিয়েই হলেন বোল্ড।  একটা করে উইকেট যায়, মিরপুরে নেমে আসে মৃত্যুপুরীর নিস্তব্ধতা।  ২৪ বলে ৩৯।  মৃত্যুপুরীকে জাগিয়ে তুললেন মাশরাফি-মাহমুদউল্লাহ।  মাশরাফি ফিরলেন।  ৬ বলে ৯ রানের সমীকরণটা কঠিন হয়ে উঠলো বড্ড।  তবে মাহমুদউল্লাহ ছিলেন।  তবে শেষ ওভারে তিনি নিতে পারলেন ৩ বলে ৪।  ২ বলে ৪ রান লাগতো, বেশি কৌশলি হতে গিয়ে বোল্ড রাজ্জাক, এর চেয়েও বড় কথা, মাহমুদউল্লাহ থাকলেন নন-স্ট্রাইকিং প্রান্তেই।  ১০ নম্বর ব্যাটসম্যান শাহাদাত হোসেন।  নিজেদের ইনিংসে শেষ ওভারে তিনি গুণেছিলেন ১৯ রান।  একটা চার, ব্যাট পাকিয়ে, উড়িয়ে ঘুরিয়ে, এধার-ওধার করে কোনো একভাবে একটা চারে শাহাদাত বনে যেতে পারতেন রূপকথার নায়ক।  লেগবাইয়ে হলো একটা রান।  হলো না শুধু রুপকথা।

আর বুকচেপে রাখা কান্নায় সিক্ত হলেন কতো অজস্র জন!

কান্না আসলে কতো রকমের?

এশিয়া কাপ টি-টোয়েন্টি ফাইনাল, ২০১৬, মিরপুর

৮ উইকেটে হার

সেই মাহমুদউল্লাহ, সেই মাশরাফি।  সেই রানতাড়া।  চার বছর আগের দুঃখ ভুললেন মাহমুদউল্লাহ, পাকিস্তানের সঙ্গে ম্যাচটা শেষ করে আসলেন।  তবে ফাইনাল সেটা ছিল না।  এ ম্যাচের জয়টা ফাইনালে তুললো বাংলাদেশকে।  বেশ দীর্ঘ এক টুর্নামেন্ট ছিল, টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপকে সামনে রেখে এশিয়া কাপ বনে গিয়েছিল এ ফরম্যাটেরই।  কোয়ালিফাইয়িং রাউন্ডও ছিল।

ভারতের সঙ্গে ফাইনালের গল্পটা টি-টোয়েন্টির মতোই ছোট।  সোজাসাপটা।  ১৫ ওভারে ১২১ রান তাড়া করা খুব সহজ নয়।  ৩০ বলে ৫০ বা ১২ বলে ১৯ রানের সমীকরণ ভারত খুব সোজা বানিয়ে ফেলেছিল উইকেটসংখ্যার ভারে।  আল-আমিনকে ছয় মেরে ম্যাচ শেষ করলেন মাহেন্দ্র সিং ধোনি।  ক্যামেরায় মুশফিকের মুখচ্ছবির অনুবাদ- ‘হলো না এবারও!’

আগামীকাল সেই ফাইনাল ম্যাচেই শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে মাঠে নামছে বাংলাদেশ।  আগামীকাল কি পারবে বাংলাদেশ নাকি আবারও সেই পুনরাবৃত্তি ?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *